B72

B 728

মহাকাশ যাত্রা প্রসঙ্গে উপগ্রহ !

 

 



  মহাকাশ যাত্রা প্রসঙ্গে উপগ্রহ এমন এক বস্তু যা ইচ্ছাকৃতভাবে কক্ষপথে স্থাপন করা হয়েছে। এই বস্তুগুলিকে পৃথিবীর চাঁদের মতো প্রাকৃতিক উপগ্রহগুলি থেকে পৃথক করার জন্য কৃত্রিম উপগ্রহ বলা হয়। 

-----------------------------------------------------------

Writer:  Md Rashed Khan Babu 


 



 


১৯৫৭ সালের ৪ অক্টোবর সোভিয়েত ইউনিয়ন বিশ্বের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ স্পুটনিক ১ উৎক্ষেপণ করে। সেই থেকে ৪০ টিরও বেশি দেশ থেকে প্রায় ৮,৯০০ টি উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করা হয়েছে। ২০১৮ এর একটি অনুমান অনুসারে, প্রায় ৫০০০ টি এখনও কক্ষপথে রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১,৯০০টি চালু থাকলেও, বাকিগুলো তাদের জীবনকাল অতিক্রম করে মহাকাশ ধ্বংসাবশেষে পরিণত হয়েছে। প্রায় ৬৩% কার্যরত উপগ্রহ পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে, ৬% পৃথিবীর মাঝারি কক্ষপথে (২০,০০০ কিলোমিটার), ২৯% ভূস্থির কক্ষপথে (৩৬,০০০ কিলোমিটার) এবং বাকী ২% বিভিন্ন উপবৃত্তাকার কক্ষপথে রয়েছে। সর্বাধিক উপগ্রহের দেশগুলির ক্ষেত্রে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বাধিক ৮৫৯ টি উপগ্রহ রয়েছে, চীন ২২০ টি উপগ্রহ সহকারে দ্বিতীয় এবং রাশিয়া ১৪৬ টি উপগ্রহ নিয়ে তৃতীয় স্থানে রয়েছে। এরপরে রয়েছে ভারত (১১৮), জাপান (৭২) এবং যুক্তরাজ্য (৫২)।[১] আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন সহ কয়েকটি বড় মহাকাশ স্টেশন আংশিকভাবে উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল এবং কক্ষপথে একত্রিত হয়েছিল। কয়েক ডজনেরও বেশি মহাকাশ প্রোব অন্যান্য বস্তুর চারদিকে কক্ষপথে স্থাপন করা হয়েছে এবং এগুলো চাঁদ, বুধ, শুক্র, মঙ্গল, বৃহস্পতি, শনি, কয়েকটি গ্রহাণু,[২] একটি ধূমকেতু এবং সূর্যের কৃত্রিম উপগ্রহে পরিণত হয়েছে।

 

কৃত্রিম উপগ্রহ বিভিন্ন উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়। বেশ কয়েকটি প্রয়োগের মধ্যে, কৃত্রিম উপগ্রহ তারা মানচিত্র এবং গ্রহের উপরিভাগের মানচিত্র তৈরি করতে এবং উপগ্রহটি যে গ্রহে উৎক্ষেপণ করা হয়েছে তার ছবি তুলতে ব্যবহার করা যেতে পারে। সাধারণ প্রকারভেদের মধ্যে সামরিক এবং বেসামরিক পৃথিবী পর্যবেক্ষণ উপগ্রহ, যোগাযোগ উপগ্রহ, দিকনির্ণয় উপগ্রহ, আবহাওয়া উপগ্রহ এবং স্পেস টেলিস্কোপ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। কক্ষপথে মহাকাশ স্টেশন এবং মহাকাশযানও কৃত্রিম উপগ্রহ।

উপগ্রহগুলি নিজেরাই বা কোনও বৃহত্তর সিস্টেমের অংশ হিসাবে একটি উপগ্রহ সংগঠন বা উপগ্রহমণ্ডলের জন্য কাজ করতে পারে।

কৃত্রিম উপগ্রহের কক্ষপথ স্যাটেলাইটের উদ্দেশ্য অনুসারে ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয় এবং এসব কক্ষপথকে বিভিন্নভাবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়। সুপরিচিত শ্রেণীগুলোর (অধিক্রমণ) মধ্যে নিম্ন পৃথিবী কক্ষপথ, মেরু কক্ষপথ এবং ভূস্থির কক্ষপথ অন্তর্ভুক্ত।

একটি লঞ্চ যানটি একটি রকেট যা একটি উপগ্রহকে কক্ষপথে স্থাপন করে। সাধারণত, এটি জমিতে একটি লঞ্চ প্যাড থেকে সরে যায়। কিছু সমুদ্রের দিকে একটি সাবমেরিন বা একটি মোবাইল সামুদ্রিক প্ল্যাটফর্ম থেকে চালু করা হয়, বা একটি বিমানের উপরে (বিমান থেকে কক্ষপথে উৎক্ষেপণ)।

 


কৃত্রিম উপগ্রহগুলি সাধারণত আধা-স্বতন্ত্র কম্পিউটার-নিয়ন্ত্রিত সিস্টেম। স্যাটেলাইট সাবসিস্টেমগুলি বিদ্যুৎ উৎপাদন, তাপ নিয়ন্ত্রণ, টেলিমেট্রি, ভঙ্গি নিয়ন্ত্রণ, বৈজ্ঞানিক উপকরণ, যোগাযোগ ইত্যাদি অনেক কাজ সম্পন্ন করে থাকে।


র কাজ: টিভি চ্যানেলগুলোর স্যাটেলাইট সেবা নিশ্চিত করাই বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের প্রধান কাজ। এর সাহায্যে চালু করা যাবে ডিটিএইচ বা ডিরেক্ট টু হোম ডিশ সার্ভিস। এছাড়া যেসব জায়গায় অপটিক কেবল বা সাবমেরিন কেবল পৌছায় নি সেসব জায়গায় এ স্যাটেলাইটের সাহায্যে নিশ্চিত হতে পারে ইন্টারনেট সংযোগ।


বঙ্গবন্ধু-১ বাংলাদেশের প্রথম ভূস্থির যোগাযোগ ও সম্প্রচার উপগ্রহ। এটি ২০১৮ সালের ১১ মে (বাংলাদেশ সময় ১২ মে) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়।[৩] এর মধ্য দিয়ে ৫৭ তম দেশ হিসেবে নিজস্ব স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণকারী দেশের তালিকায় যোগ হয় বাংলাদেশ। এই প্রকল্পটি ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের অধীন বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন কর্তৃক বাস্তবায়িত হয় এবং এটি ফ্যালকন ৯ ব্লক ৫ রকেটের প্রথম পণ্য উৎক্ষেপণ ছিল।


বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ (BANGABONDHU-1) বাংলাদেশের প্রথম ভূস্থির যোগাযোগ উপগ্রহ। এটি ১১ মে ২০১৮ ইডিটি, বাংলাদেশ মান সময় ১২ মে ভোর ০২:১৪ তে কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়।[৩] এর মধ্য দিয়ে ৫৭ তম দেশ হিসেবে নিজস্ব স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণকারী দেশের তালিকায় যোগ হয় বাংলাদেশ। এই প্রকল্পটি ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন কর্তৃক বাস্তবায়িত হয় এবং এটি ফ্যালকন ৯ ব্লক ৫ রকেটের প্রথম পেলোড উৎক্ষেপণ ছিল।

 


ইতিহাস


২০০৮ সালে বাংলাদেশে টেলিযোগাযোগ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি কৃত্রিম উপগ্রহ নির্মাণ বিষয়ে একটি কমিটি গঠন করে। এরপর ২০০৯ সালে জাতীয় তথ্যপ্রযুক্তি নীতিমালায় রাষ্ট্রীয় কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণের বিষয়টি যুক্ত করা হয়। বাংলাদেশের নিজস্ব কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণের জন্য আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন ইউনিটের (আইটিইউ) কাছে ইলেক্ট্রনিক আবেদন করে বাংলাদেশ। কৃত্রিম উপগ্রহ ব্যবস্থার নকশা তৈরির জন্য ২০১২ সালের মার্চে প্রকল্পের মূল পরামর্শক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘স্পেস পার্টনারশিপ ইন্টারন্যাশনাল’ কে নিয়োগ দেওয়া হয়। স্যাটেলাইট সিস্টেম কিনতে ফ্রান্সের কোম্পানি থ্যালাস অ্যালেনিয়া স্পেসের সঙ্গে এক হাজার ৯৫১ কোটি ৭৫ লাখ ৩৪ হাজার টাকার চুক্তি করে বিটিআরসি। ২০১৫ সালে বিটিআরসি রাশিয়ার উপগ্রহ কোম্পানি ইন্টারস্পুটনিকের কাছ থেকে কক্ষপথ (অরবিটাল স্লট) কেনার আনুষ্ঠানিক চুক্তি করে।[৪]

২০১৭ সালে কৃত্রিম উপগ্রহের সার্বিক ব্যবস্থাপনার জন্য ‘বাংলাদেশ কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট কোম্পানী লিমিটেড’ নামে একটি সংস্থা গঠন করা হয়। এই সংস্থার প্রাথমিক মূলধন হিসেবে অনুমোদন দেওয়া হয় পাঁচ হাজার কোটি টাকা।


নির্মাণ ব্যয়


কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণের মাধ্যমে বাংলাদেশে সম্প্রচার ও টেলিযোগাযোগ সেবা পরিচালনার জন্য ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে একনেক সভায় দুই হাজার ৯৬৮ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে বরাদ্দ দেওয়া হয় এক হাজার ৩১৫ কোটি ৫১ লাখ টাকা, যা মোট ব্যয়ের প্রায় ৪৪ শতাংশ। এ ছাড়া ‘বিডার্স ফাইন্যান্সিং’ এর মাধ্যমে এ প্রকল্পের জন্য এক হাজার ৬৫২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে হংক সাংহাই ব্যাংকিং করপোরেশনের (এইচএসবিসি) সাথে সরকারের প্রায় একহাজার ৪০০ কোটি টাকার ঋণচুক্তি  হয়। এক দশমিক ৫১ শতাংশ হার সুদসহ ১২ বছরে ২০ কিস্তিতে এই অর্থ পরিশোধ করতে হবে।

২০১৪ সালের ডিসেম্বর মাসে রাশিয়ার সংস্থা ইন্টারস্পুটনিকের কাছ থেকে অরবিটাল স্লট অনুমোদন দেওয়া হয়। এর অর্থমূল্য ২১৮ কোটি ৯৬ লাখ টাকা।


বিবরণ


বঙ্গবন্ধু-১ কৃত্রিম উপগ্রহটি ১১৯.১° ডিগ্রী পূর্ব দ্রাঘিমার ভূস্থির স্লটে স্থাপিত হবে। এটিকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে নামকরণ করা হয়েছে। ফ্রান্সের থ্যালিস অ্যালেনিয়া স্পেস কর্তৃক নকশা ও তৈরি করা হয়েছে এবং এটি যুক্তরাষ্ট্রের ব্যক্তিমালিকানাধীন মহাকাশযান সংস্থা স্পেস এক্স থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ ১৬০০ মেগাহার্টজ ক্ষমতাসম্পন্ন মোট ৪০টি কে-ইউ এবং সি-ব্যান্ড ট্রান্সপন্ডার বহন করবে এবং এটির আয়ু ১৫ বছর হওয়ার কথা ধরা হয়েছে।[৫] স্যাটেলাইটের বাইরের অংশে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকার রঙের নকশার ওপর ইংরেজিতে লেখা রয়েছে বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু ১। বাংলাদেশ সরকারের একটি মনোগ্রামও সেখানে রয়েছে।


কারিগরি বৈশিষ্ট্য


বিএস-১ উপগ্রহটি ২৬টি কে-ইউ ব্যান্ড এবং ১৪টি সি ব্যান্ড ট্রান্সপন্ডার সজ্জিত হয়েছে ১১৯ দশমিক ১ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমার কক্ষপথের অবস্থান থেকে। কে-ইউ ব্যান্ডের আওতায় রয়েছে বাংলাদেশ, বঙ্গোপসাগরে তার জলসীমাসহ ভারত, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়া অঞ্চল। সি ব্যান্ডেরও আওতায় রয়েছে এই সমুদয় অঞ্চল।


সুবিধা


বঙ্গবন্ধু ১ স্যাটেলাইট থেকে ৩ ধরনের সুবিধা পাওয়া যাবে।


টিভি চ্যানেলগুলো তাদের সম্প্রচার কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য স্যাটেলাইট ভাড়া করে। এক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট চ্যানেলের সক্ষমতা বিক্রি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয় হবে। আবার দেশের টিভি চ্যানেলগুলো যদি এই স্যাটেলাইটের সক্ষমতা কেনে তবে দেশের টাকা দেশেই থাকবে। এর মাধ্যমে ডিটিএইচ বা ডিরেক্ট টু হোম ডিশ সার্ভিস চালু সম্ভব।


বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটের ৪০টি ট্রান্সপন্ডারের মোট ফ্রিকোয়েন্সি ক্ষমতা হলো ১ হাজার ৬০০ মেগাহার্টজ। এর ব্যান্ডউইডথ ও ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহার করে ইন্টারনেটবঞ্চিত অঞ্চল যেমন পার্বত্য ও হাওড় এলাকায় ইন্টারনেট সুবিধা দেয়া সম্ভব। প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইন্টারনেট ও ব্যাংকিং সেবা, টেলিমেডিসিন ও দূরনিয়ন্ত্রিত শিক্ষাব্যবস্থা প্রসারেও ব্যবহার করা যাবে বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট।


বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় মোবাইল নেটওয়ার্ক অচল হয়ে পড়ে। তখন এর মাধ্যমে দুর্গত এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা চালু রাখা সম্ভব হবে।


বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর ওজন ২,৬৫০ কেজি এবং এতে ৪০টি ট্রান্সপন্ডার রয়েছে। এটি ১৬০০ মেগাহার্টজ ফ্রিকোয়েন্সি সহকারে টেলিভিশন, রেডিও, ইন্টারনেট এবং অন্যান্য যোগাযোগ সেবা প্রদান করে।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর সুবিধাগুলির মধ্যে রয়েছে:


 


এটি বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোকে শক্তিশালী করবে এবং দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে টেলিযোগাযোগ সেবা প্রসারিত করবে।


এটি বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশে সহায়তা করবে।


এটি বাংলাদেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, এবং অন্যান্য সামাজিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করবে।


বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এটি বাংলাদেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নে একটি বড় অবদান রেখেছে।


No comments:

B78

Powered by Blogger.